বাক্‌ ১১৩ ।। সম্পাদকীয় ।। অনুপম মুখোপাধ্যায়


।। কবির ভূমিকায় অভিনয় করতে করতে ১দিন আমরা সবাই সত্যিকারের কবি হয়ে যাব না তো? হয়ে গেলেই মন্দ কী?  আমরা সকলেই জানি কবির মধ্যে কোনো বিপদ নেই। বিপজ্জনক হতে পারে লেখা। কোন লেখা বিপজ্জনক? যে লেখা নিয়ে চিন্তা করতে হয়। চিন্তা হল বারুদের চেয়ে বিপজ্জনক, এ কে ৪৭-এর চেয়ে মারাত্মক। এটা মনে রাখা ভালো। কারণ, মন আপনার দেবতা।
          পাঠকের নাম হয়ত জানা যাবে না। কোনোদিন হয়ত তার সঙ্গে কথা হবে না। আমরা অনেক সময়ই এমন ব্যক্তিকে নিজেদের পাঠক ভাবি, যে আসলে লেখক, কিন্তু ঠিকঠাক লিখতে শেখেনি, লিখতে পারে না। সে এসেছে আত্মবিশ্বাসের খোঁজে আর আমরা পাচ্ছি আত্মপ্রসাদ। অথবা, লেখার জগতের সহকর্মীদের ভাবছি নিজেদের পাঠক। এটা আরো মারাত্মক। একজন রাঁধুনী তার রান্না আরেক রাঁধুনীর জন্য, একজন ডাক্তার তার দক্ষতা আরেক ডাক্তারের জন্য, একজন মুচি তার হস্তকৌশল আরেক মুচির জন্য রাখে না। কিন্তু একজন কবি আরেকজন কবির প্রশংসা পেলে গলে যায়, নিন্দা পেলে মুষড়ে পড়ে, সে অ-কবিদের পাত্তাই দিতে চায় না। পাঠক কাকে বলে, সে তখন আর ভেবে দ্যাখে না। এটাও ভেবে দ্যাখে না, সহকর্মীর ঈর্ষা থাকতে পারে, অকারণ স্নেহও থাকতে পারে। তার মতামতটা প্রভাবিত হতেই পারে।
          ভবভূতি এক জায়গায় লিখেছেন- কবিকে অকবি বলে আর সতীকে অসতী বলে দুর্জনরা সুখ পায়। আর সুজনদের কী হবে? যাঁরা তেঁতুলপাতা শেয়ার করেই আনন্দ পান? আমাদের অনেকের ছেলেবেলায় টিভিতে সিনেমা হত। সাদাকালো টিভি। কালোসাদা সিনেমা। শনিবার হিন্দি। রবিবার বাংলা। সারা সপ্তাহের হাপিত্যেশ। বিশেষ করে রবিবার বিকেলের জন্য মা-বোন-দিদি-বৌদি-কাকিমা-জেঠিমাদের একটা আলাদা অপেক্ষা থাকত। তাঁরা শনিবারের শশী কপূর শাম্মি কপূরদের খুব একটা দেখতেন না, রান্নার ফাঁকে এসে বসতেন, উঁকি-টুকি দিতেন গানের আওয়াজ পেলে। রবিবারটা আলাদা ব্যাপার। খবরের কাগজে দেখা যেত আছে সুচিত্রা সেন-উত্তমকুমার অভিনীত ‘শাপমোচন’, অথবা ‘সবার উপরে’। কিংবা তাপস পাল-দেবশ্রী রায়ের কোনো ‘গানভিত্তিক’ সিনেমা। রবিবারের সকাল থেকে মহিলাদের মুখে আলাদা উজ্জ্বলতা। পুরুষদের মুখ প্রসন্ন। পাড়ায় যাদের টিভি নেই, বাচ্চাদের পড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে, বা টিভি কেনাটা বিলাসিতা বলেই, ভিড় করে আসতেনপানের গন্ধ, জর্দামিশ্রিত, অথবা দোক্তা, চায়ের গেলাসের আওয়াজ, বিভিন্ন আঁচলের খসখসএকটা হাল্কা উৎসব। কিন্তু যেদিন থাকতেন সত্যজিৎ রায় তাঁর কোনো সিনেমা নিয়ে, মহিলাদের উজ্জ্বলতা আর পুরুষদের প্রসন্নতা প্রায় গায়েব। সেদিন ভিড় কম। জর্দার গন্ধ কম। চায়ের গেলাসের আওয়াজটা মনমরা। শেষ অবধি সিনেমাটা বাড়ির বাচ্চারাই দেখত। বড়রা গল্পগুজব করে কাটিয়ে দিতেন। আর যদি থাকতেন মৃণাল সেন তাঁর ‘ইন্টারভিউ’ বা ‘আকালের সন্ধানে’ নিয়ে, সেদিন ভিড় আর বলা যায় না। যে দু-চারজন এসেছিলেন, খবরের কাগজ দেখেননি বলেই, আধঘন্টার মধ্যে চলে গেলেন। বাড়ির কর্তা নিজেই সেই যে পান খেতে গেলেন পাড়ার মোড়ে, সাতটার আগে বাড়ি ফিরলেন না। কার সঙ্গে যেন দেখা হয়ে গিয়েছিল।
       সুচিত্রা সেন আর মৃণাল সেনের মাঝখানে এই যে এক দুস্তর খাদ, সেখানে বনলতা সেনহীনভাবে কবিতা নিয়ে বেঁচে থাকা খুব কষ্টকর। ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ ‘তুমি যে আমার’ বা ‘শোনো বন্ধু শোনো প্রাণহীন এই শহরের ইতিকথা’-র রকমফের করেই চলছে বাংলা কবিতার বাজার। ধুঁকে ধুঁকে। নাহলে কর্তা পান খেতে বেরিয়ে যাবেন, কবির লেখা বন্ধ না হওয়া অবধি কার সঙ্গে যেন তাঁর দেখা হয়ে যাবে।
          তথাকথিত পাঠকের প্রশংসা তো সন্দেহজনক। আপনার কবিতা বা লেখার স্তুতি করেই তিনি এমন লেখা বা সো কলড কবিতার অকুন্ঠ সুখ্যাতি করতে পারেন যেখানে আপনার মতে লেখা বা কবিতা ব্যাপারটাই নেই। তাহলে আপনার লেখায় তাঁর প্রশংসার আর কি কোনো মূল্য রইল আপনার কাছে? আর যাঁরা সত্যিই বোদ্ধা, সত্যিকারের রসিক, তাঁরা আপনার সম্পর্কে কোনো শব্দ খরচ করার আগে দশ হাজারবার ভাববেন। আপনাকে মাপবেন। আপনি যদি দুর্ধর্ষ কিছু কাজ করেও থাকেন, তাতে তাঁদের কী? বরং তাঁদের অসুবিধাই হতে পারে। আপনার যে ব্যাপারটা শক্তি, সেটা তাঁদের হিরোসিমায় পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটাবে না, এটা কি কেউ বলতে পারেন?
         এভাবেই আমরা চলছি। এবং, বাংলা কবিতা আজ পৃথিবীর মধ্যে পিছিয়ে নেই। আমরা কবিতা নিয়েই বেঁচে আছি। কবিতা আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। রাখবে। কবিতাহীনভাবে বেঁচে থাকার কোনো মানেই হয় না। এবং, যেহেতু, কবিতা লেখার কোনো মানে হয় না, লেখা কবিতারও কোনো মানে হয় না।
                                                                                 

বাক্‌ ১১৩ : চৈতালী চট্টোপাধ্যায়




আগমনী

তালপুকুরে আজ ঘটি ডোবে না!
জীবন ফুরিয়ে গেছে,
কিন্তু, তারপর, শ্লেষ, রক্ত, প্রতারণা,
উঠত তো!
শরৎকালের ওই আকাশ এখনও
খানিকটা নীল ফেলে দেয়
গাছ ছায়া দেয়
পাখি গান দেয়
আমি পাশে বসে আছি
শত্রু গজিয়ে উঠছে নখে
কোমরও সাম্প্রদায়িক,ভারে নুয়ে আসছে
চোখ, টানটান, মেলে রাখি
কেননা, ফাৎনার মতো, ঘটি ডুবব-ডুবব ভাবছে,
যদি প্রেম উঠে আসে পাড়ে

                        (চিত্রঋণ : Graciela Iturbide)

বাক্‌ ১১৩ ।। পুনরাধুনিক কবিতা ।। রাণা বসু




সামুদ্রিক স্তন

সকালবেলা সমুদ্রের এপার থেকে ওপারের কিছু বোঝা না গেলেও সন্ধ্যেবেলায় বেশ বোঝা যাচ্ছিল যে, ওপারে জনবসতি আছে, কারন আলো দেখা যাচ্ছিল। আমার সমুদ্র দেখলেই মনে হয় ওপারটা নিশ্চই শ্রীলঙ্কা। চারপাশে সমুদ্রের অজস্র স্তন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এক একবার পাড়ে এসে আছড়ে পড়লেই দুধ ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। দুধে স্নান করার এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা হচ্ছে আমার। স্তনগুলো বিভিন্ন প্রকারের এবং তাদের আছড়ে পড়াও বিভিন্নরকম। স্বাভাবিকভাবেই দুধের পরিমানও কম বেশি। এখানে এসে বাসুর ১২০০/- দামের চশমা হারানো - মধুখেলা - সিলনোড়া বা মুখ থেকে ফলিডলের গন্ধ পাওয়া নিয়ে কিছু বলা যায় না। সমুদ্র অত কথা বোঝে না, সে স্তনের আদরের বিনিময়ে এরকম কিছু জিনিস ছিনিয়ে নেয়। আবার ফেরতও দেয়, অবুঝের মত।

প্রেম এখানে এসে ভরা থাকে স্মৃতি সুধায়, হৃদয়পাত্রে। প্রেম একপ্রকারের জরুল, আমি সমুদ্রের ধারে বসে জরুলের সেই টান অনুভব করছিলাম- ভেসে যাচ্ছিলাম জোয়ারের দিকে - ভাঁটার টান তখন অমাবস্যার চাঁদ। প্রত্যেকটা স্তনের মুচড়ে পড়ার সময় বাবার মুখের অস্বস্তি আর যন্ত্রণার কথা মনে পড়ছিল। আমি সিগারেট খাচ্ছিলাম একটানা বাতাসের মত - নিবিড় ও শান্তভাবে। পমফ্রেট মাছের মত চ্যাপ্টা ধোঁয়ায় তখন চারিদিক আক্রান্ত - স্থির কোনো কোনো জলবিন্দু দুধের ফোঁটায় লেগে আমায় মাঝে মাঝে বিব্রত করছিল-- বাবার অজস্র মুখ তখন আছড়ে পড়ছিল বেদীগুলোয়। বাবা স্বস্তি পায়নি। হয়ত আমার সমুদ্রের দিকে ছোঁড়া সিগারেটের পঁদীগুলোর দিকে চেয়েছিল একদৃষ্টে। তাই আছড়ে পড়ছিল বারবার।সমুদ্রের স্তনে ঠোঁট রাখলে সিগারেট খাওয়া যায়না। বাবা বেশি বিড়ি খেত অবশ্য।


            " যে পথে যেতে হবে
              সে পথে তুমিই একা"-র মতো করে সামুদ্রিক উট ঘোরাফেরা করছে।মাঝে মাঝে সামুদ্রিক স্তনের আছড়ে পড়ে ছড়ানো দুধ সদ্য নিষিক্ত ডিম্বানুতে দুধের রেণু ভরে দিয়ে যাচ্ছে। আমি বসে আছি সমুদ্রের পাশে -- সামুদ্রিক রেলিঙের ওপর।

ওপারে এখন হয়ত শ্রীলঙ্কার মেয়েরা স্নান করছে। তাদের স্তনযোনিছোঁয়া জল এপারে আসছে এবং অপেক্ষা করছে সদ্য মাস্টারবেট করা শিশ্ন নির্গত শুক্রানুর। তারপর তারা ফিরে নিয়ে যাচ্ছে ও অন্য কোনও যোনিতে স্থাপন করছে। প্রাকৃতিক নিষেক ঘটাচ্চে সমুদ্র তার সারা শরীর দিয়ে।আমি সিগারেট ছুঁড়ে ফেলে বাবার কথা ভুলে ছুটে গিয়ে মাস্টারবেশনে বসলাম - ১ দুই তিন 4 পাঁচ ৬.....
 সারাদিন সঙ্গোপনে/ সুধারস ঢালবে মনে/ পরাণের পদ্মবনে/ বিরহের বীণাপানি।।

বাবাকে দিনের আলোয় দেখতে পাচ্ছি না আর। শ্রীলঙ্কার আলোরও কোনও দাগ নেই। চলো সমুদ্র- চলো বাবা ও শ্রীলঙ্কা - চলো টাটা - চলো জামশেদপুর।।

                                                     (চিত্রঋণ : সালভাদর দালি)

বাক্‌ ১১৩ ।। পুনরাধুনিক কবিতা ।। রেনেসাঁ




লেখা

কোমল একটা সা লিখতে চেয়েছি কবিতায় কত

অসফল কলম বেজেই যায় কষ্টের নিধাপানিনিধা

জানিনিজানি
জানিসাজানি
অমন লেখা লিখতে পারি না
কষ্ট বাজে হারমোনিয়ামে
পথে পথে ঘুরে ঘুরে ঘুরে ঘুরে কষ্ট
বাড়ি ফেরে বাড়ি ফেরে
নিনিসা


লেখা হয়না কিচ্ছু



আলো-অন্ধকার

দ্ভু রাত
আশ্চর্য তাঁত
ছটফটে ছটফটে

আলোআলো ছুলি
জলরঙ আর তুলি
ফুটফুটে

শ্রাবণের রাত
দরবারি রাগে ভিজতে থাকে টুনিবাল্বগুলো
ইশ্কজলে ফুবে ভিজে ঠোঁট ফুলিয়ে নিভে যায়



বাবা-মা

হেলো হেলো
মাইক টেষ্টিং

রাস্তার ভিড় কামড়ে বাবা বিয়ে করতে আসছে, হলদিবাড়ি

মার চোখ বাগান
ডালে ডালে ফুটে ফুটে উঠছে চাঁদ

এখন চাঁদ বুড়ো হয়ে যাওয়া
এখন চাঁদ ধোঁয়া ধোঁয়া হাওয়া

চাঁদ বুড়ো হয়ে যাক
চাঁদ গুঁড়ো হয়ে যাক
বাবামা সাতপাকে ঘুরতে থাকে আমাকে আর ভাইকে নিয়ে
বৃষ্টি সাক্ষী….
                                                     
                                (চিত্রঋণ : রেনেসাঁ)